Contents

Lichess 2020 Spring Marathon Experience

Contents

গত ১৮ তারিখে Lichess-এ 2020 Spring Marathon হয়ে গেল । এটি একটি দাবা ম্যারাথন টুর্নামেন্ট । আমরা সবাই ম্যারাথন সম্পর্কে জানি । ম্যারাথন একটি দীর্ঘ দূরত্বের দৌড় প্রতিযোগিতা । যে প্রতিযোগিতায় দূরত্ব থাকে ৪২ কিলোমিটারের একটু বেশি । এই ম্যারাথন দৌড়ের উৎপত্তি হয় খ্রিস্ট পূর্ব ৪৯০ সালে গ্রিক এবং পার্সিয়ানদের মাঝে এক যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা থেকে । সে যুদ্ধে পার্সিয়ানরা গ্রিকদের সকল দ্বীপ দখল করার জন্য একের পর এক আক্রমণ করে যায়, বাকি রয় এথেন্স আর ম্যারাথন । ম্যারাথন জয় করার লক্ষ্যে পার্সিয়ানরা ৩০০ যুদ্ধ জাহাজে করে ৩৬,০০০ দক্ষ যোদ্ধা নিয়ে আসে । এইদিকে এথেন্স আর প্লাটাইয়ার সব যোদ্ধা মিলেও তাদের মত যোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ১১,০০০ । গ্রিকদের স্বাধীনতা নির্ভর করছে এই যুদ্ধে । এথেনিয়ানরা হয়ে পরলেন চরম উদ্বিগ্ন । বেশ কিছুদিন অপেক্ষার পরে ম্যারাথনে যুদ্ধ শুরু হয় এবং আশ্চর্য ভাবে গ্রিকরা জিতে যায় ! এই বিজয়ের খবর উদ্বিগ্ন এথেনিয়ানদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গ্রিক বার্তা প্রেরক ফাইডিপিডিস্‌ (Pheidippides) এক দৌড়ে ম্যারাথন থেকে এথেন্স শহরে পৌঁছে উদ্বিগ্ন এথেনিয়ানদের বিজয়ী বার্তা দেন এবং পরমুহুর্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন! তাঁরই স্মরণে এই ম্যারাথন দৌড় ।

Lichess অনলাইন দাবা সার্ভার ম্যারাথন আয়োজন করে । তবে সেটি দৌড়ের নয়, দাবা খেলার! এই দাবা ম্যারাথনটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং টুর্নামেন্টটি চলে ২৪ ঘণ্টা । এই ২৪ ঘণ্টার মাঝে যে যতও গেম খেলতে পারে, একটি গেম জয়ের জন্য ১ পয়েন্ট, ড্রয়ের জন্য ১/২ পয়েন্ট । ২৪ ঘণ্টা শেষে যে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পাবেন সেই হবেন এই টুর্নামেন্টের বিজেতা।

./tournamentDetails.webp
Tournament details

আমি কখনো দৌড় ম্যারাথনে অংশ নেই নি । Lichess-এর দাবা ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে তা হয়ে ওঠে নি । করোনা ভাইরাসের সংক্রামণের কারণে হোম কোয়ারেন্টিনে বসে আছি, এমন সময় দেখি Lichess 2020 Spring Marathon এর ঘোষণা দেয় । সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম এবার দাবা ম্যারাথন খেলবো ।

ম্যারাথন শুরু হয় বাংলাদেশি সময় ১৮ তারিখ সকাল ৬ টায় । যেহেতু ২৪ ঘণ্টা টানা খেলতে হবে তাই আগের রাতে পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে সকাল ৫টায় ঘুম থেকে উঠি । ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ চালু করে টুর্নামেন্ট পেজে গিয়ে দেখি আরও ১৫-২০ মিনিট বাকি । তখন মোট খেলোয়াড়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮,০০০ হাজার ! বলা জরুরী এই ম্যারাথন ছিল বুলেট দাবা খেলার । মানে এই খেলায় সময় খুব অল্প । দুই জন খেলোয়াড়ের ঘড়িতে সময় থাকবে মাত্র ২ মিনিট করে! এর মধ্যে খেলা শেষ করতে হবে, যার সময় আগে শেষ হয়ে যাবে সে পরাজিত, তবে প্রতি চালের সাথে মাত্র ১ সেকেন্ড করে ঘড়িতে যুক্ত হবে । বুলেট দাবাড় রেটিং-এর ভিত্তিতে টুর্নামেন্টে আমার অবস্থান ছিল ৪,০০০ এর পরে । তারপরেও বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলা শুরু করলাম ।

প্রথম খেলাটি জিতলাম, তারপরে পরপর দুইটা গেম হারলাম, আবার একটা জিতলাম । এভাবে চলতে থাকল । কারণ উপড়ের ছবিতে দেখা যাচ্ছে এই সকল প্লেয়ারের গড় রেটিং ১৬৯৫, যেখানে আমার রেটিং ছিল ১৬৫২ । তাঁর মানে এই টুর্নামেন্টে সকল খেলোয়াড়দের মাঝে অবস্থান করছি । তাই একাধারে জিতবো এমনটা কখনোই হবে না । হারবো জিতবো এভাবে চলতে থাকবে । এর মাঝে রেটিং নিয়ে একটু বলি । একজন খেলোয়াড়ের দক্ষতা পরিমাপের জন্য এই রেটিং ব্যবহার করা হয়ে থাকে । সাধারণত আন্তর্জাতিক দাবার গভার্নিং বডি ফিদের (FIDE) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রেটিং ১০০০ থেকে শুরু হয় । সাধারণত দাবাড় সর্বোচ্চ মর্যাদা Grand Master খেতাবধারীদের রেটিং হয় সাধারণত হয় ২৪০০ থেকে ২৯০০ । ১,৯৯৯ রেটিং পর্যন্ত খেলোয়াড়দের এমেচার এবং ২,০০০ কিংবা এর বেশি রেটিং সম্পন্ন খেলোয়াড়দের এক্সপার্ট বলা হয়ে থাকে ।

খেলা চলতে থাকল , একের পর এক খেলে যাচ্ছি । জিতছি হারছি । তবে জয়ের চেয়ে হারের পরিমাণ অনেক বেশিই ছিল । এইদিকে টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়ের পরিমাণ বেড়ে চলছে । কেও ২৪ ঘণ্টা খেলতে বাধ্য নয় । যখন ইচ্ছে কেও খেলা বন্ধ করতে পারে আবার চালু করতে পারে । এই সুযোগে সকালে নাস্তা করে নিলাম । নাস্তা করার সময় দেখলাম আমেরিকান সুপার গ্র্যান্ড মাস্টার গাতা কামস্কি(Gata Kamsky) খেলাছেন! যিনি কিনা এক সময় বিশ্বের ৪র্থ খেলোয়াড় ছিলেন,১৯৯৬ সালে ফিদে বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল খেলেন, ২০০৭ সালে দাবা বিশ্বকাপ জিতেন । তিনি একটু দেরিতে শুরু করেও দ্রুত শীর্ষ ১০ স্থানে চলে যান । নাস্তা করার সময় তাঁরই খেলা দেখছিলাম । তাঁর সাথে একটা গেম খেলতে পারলে মন্দ হত না । এই ভাবতে ভাবতে নাস্তা শেষকরে আবার খেলা শুরু করলাম ।

আমার প্রথমে লক্ষ্য ছিল সেরা ৫০০ এর মধ্যে থাকবো । খেলোয়াড়ের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছিলো বিধায় সে লক্ষ্য অর্জন নিয়েও চিন্তায় ছিলাম । তবে আমার স্ট্রাটেজি ছিল আমি প্রচুর গেম খেলবো, যেহেতু আমার জয়ের রেট কম, সেটা পূরণ করবো বেশি গেম খেলে । দুপুরের দিক থেকে আমি মূলত আমার চেয়ে অনেক দক্ষ খেলোয়াড়দের মোকাবেলা করছিলাম । কারণ ২-১ টি করে গেম জিততে জিততে আমার অবস্থান ১,০০০ এর ভিতরে চলে এসেছিলো । আর শীর্ষ ১,০০০ এর ভিতরে, প্রায় সকল খেলোয়াড়ের রেটিং ২,০০০+ আমার যেখানে ১৬০০+! পাশের ছবিতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের গড় রেটিং (Average opponent) ছিল ২১০৪।

./performance.webp
Performance

বিকেলের দিকে ওয়ারজেফ শুনছিলাম আর মাথা দুলাতে দুলাতে খেলে যাচ্ছিলাম । হঠাৎ দেখি আমার গেম দেখার জন্য অনেক কিবিতজার(দাবা দর্শক) চলে আসছে। আমারতো এতো ফলোয়ার নেই, এতো দর্শক আসলো কোত্থেকে । তাকিয়ে দেখি আমি সেই আমেরিকান গ্র্যান্ড মাস্টার গাতা কামস্কির সাথে খেলছি! তখন ১৩-১৪ চাল খেলে ফেলেছি । আমার পজিশন আমার ভালোই লাগছিলো । তারপর বিচলিত হয় পড়লাম । বিচলিত হওয়াই স্বাভাবিক । খেলা শেষে দাবা ইঞ্জিন দিয়ে এনালাইসিস করে দেখি ১৫তম চালের পরে আমার পজিশন জিতার মত ছিল! Stockfish 11 দেখাচ্ছিল কালোর জন্য ১৫তম মুভের পর ৪.৬ এডভান্টেজ ছিল । যেটা দাবায় সহজে জিতার মত এডভান্টেজ বলা হয়ে থাকে। আমি সেই জিটার ট্যাক্টিকাল সিকোয়েন্স ধরতে পারি নি । পরে ধীরে ধীরে ৩২ তম চালে আমার নিশ্চিত হার হওয়ায় গেমটি রিজাইন করে দেই । পাশে আমার এনোটেশনসহ পুরো গেইমের এনালাইসিস দেওয়া হল । প্রত্যেক চালের পিছনে আমার চিন্তা ধারা এবং ব্যাখ্যা দেওয়া আছে ।
গেম লিঙ্কঃ GM Gata Kamsky vs Sarowar Hossain

গ্র্যান্ড মাস্টারের সাথে জিততে না পারলেও একজন ক্যান্ডিডেট মাস্টারের সাথে ঠিকই জিততে সক্ষম হয়েছি !

মজার ব্যাপার হল তার Lichess প্রোফাইলে একটা উক্তি দেওয়া আছে, সেটি হল “Be careful with the weakest player, sometimes it is the strongest”! তা বটে দাদা মশাই!
Sarowar Hossain vs CM WildTricks (lichess handle)


আরেকটি উল্লেখযোগ্য গেম হচ্ছে ইতালিয়ান ন্যাশনাল মাস্টার Luca Albertini-এর সাথে । যেখানে আমার একদম জিতা পজিশন ছিল, ক্যাল্কুলেট না করতে পেরে হাতে মাত্র ৩৫ সেকেন্ড ছিল বিধায় ড্র নিয়ে নেই ।

NM Luca Albertini vs Sarowar Hossain

আরও দুইটি উল্লেখ্য যজ্ঞ গেইম আছে, যেখানে দুজন ২৫০০ এবং ২৪০০ রেটিং প্লেয়ারের সাথে জয় লাভ করতে সক্ষম হই ।
গেম দুটি যথাক্রমে,



আমার কৌশল মূলত এটাই ছিল যে, যেখানে আমার রেটিং টুর্নামেন্টের গড় রেটিং এর চেয়ে কম সেখানে আমি জিতার চেয়ে অনেক বেশি হারবো । হয়েছেও তাই, মাত্র ২৭% গেম জিতেছি! এমনও হয়েছে টানা ১০টির বেশি গেম হেরেছি , কিন্তু থেমে যাই নি । ১৮-১৯ ঘণ্টা খেলার পরে দেখি শীর্ষ ৫০০ এর ভিতরে ঢুকছি বের হচ্ছি । ভাবলাম সকাল ৬ তা পর্যন্ত খেললে অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা খেললে হয়তো শীর্ষ ৫০০ এর ভিতরে থাকতে পারবো । কিন্তু ক্লান্তির কারণে পেরে উঠছিলাম না । সাধারণত মস্তিষ্ক শরীরের প্রায় ২০% শক্তি ব্যবহার করে, তবে সেদিন আমার পুরোটাই মস্তিষ্ক ব্যবহার করেছিল বলে আমি নিশ্চিত। বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুম ভাঙল ৩ ঘণ্টা পর সকাল ৪:৩০-এর দিকে । সাথে সাথে উঠে টুর্নামেন্ট পেজে এসে দেখি র‍্যাঙ্ক ১০০০ এর বাইরে চলে গেছে । তখন চিন্তা করলাম ১ ঘণ্টা কিছু গেইম খেলে যদি অন্তত শীর্ষ ১০০০ এর ভিতরে থাকতে পারি । আবার খেলা শুরু করলাম, জিততে আর পারছিলাম না, একের পর এক হেরেই যাচ্ছিলাম, কারণ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়ের সংখ্যা তখন ২২,০০০ ছাড়িয়ে! তারপরেও কিছু গেইম জিতে শীর্ষ ১,০০০ এর ভিতরে আসতে সক্ষম হয় ।টুর্নামেন্টের শেষে ২৭২টি গেম খেলে আমার অবস্থান ছিল ২২,৪৯৭ খেলোয়াড়দের মাঝে ৯৮৭ আমার আশেপাশে আমার চেয়ে কম রেটেড দাবাড়ু আর দেখি নি । তার মানে বলা যায় আমার কৌশল কিছুটা হলে কাজে লেগেছিল ।

সব মিলিয়ে প্রথম দাবা ম্যারাথনের অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ, এখন আমি দাবা নিয়ে আগের চেয়ে আরও বেশি অনুপ্রাণিত । মানুষকে এই অসাধারণ খেলাটির প্রতি আবার অনুপ্রাণিত করতে এবং বাংলাদেশে দাবার স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে এমন সব আয়োজন অনেক গুরুত্বপূর্ণ । আমার এই সম্পূর্ণ লিখাটির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দাবা খেলা প্রচার করা, যাতে করে আমাদের দেশের মানুষ আগের মতো আবার দাবার দিকে ধাবিয়ে পড়ে, এই অসাধারণ সুন্দর খেলাটির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় ।

দাবা খেলুন, শিখুন, শিখান ।

টুর্নামেন্ট লিঙ্ক Lichess Spring Marathon 2020